বুধবার, ২২ জুলাই ২০২৬, ৭ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ভেনিজুয়েলায় ভূমিকম্পে নিহত বেড়ে ৫৮৯

ভেনিজুয়েলায় গত বুধবারের (২৪ জুন) দুটি বিধ্বংসী ভূমিকম্পে ধসে পড়া ভবনের ধ্বংসস্তূপের ভেতরে বহু মানুষ আটকা পড়ে রয়েছেন। সেখানে জীবিতদের সন্ধানে চলমান জরুরি উদ্ধার অভিযানে যোগ দিয়েছে আন্তর্জাতিক উদ্ধারকারী দলগুলো। এর মধ্যে ব্রাজিল, কানাডা, মেক্সিকো, কলম্বিয়া, এল সালভাদর, কিউবা ও যুক্তরাষ্ট্র দেশটিতে উদ্ধারকারী দল পাঠিয়েছে। আজ শুক্রবারও (২৬ জুন) দেশটিতে অনুসন্ধান ও উদ্ধারকারী দল এবং মানবিক সহায়তা পাঠানো অব্যাহত রয়েছে। ভূমিকম্পে নিহত বেড়ে ৫৮৯ জনে দাঁড়িয়েছে বলে জানান দেশটির কর্মকর্তারা। খবর আলজাজিরার।

জাতিসংঘের ত্রাণ বিষয়ক সংস্থার প্রধান টম ফ্লেচার বলেছেন, ভেনেজুয়েলার জনগণ এবং যাদের স্বজনরা ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে রয়েছেন, জেনে রাখুন আমরা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ—আপনাদের কাছে সাহায্য পৌঁছাবে।

গত বুধবারের ৭ দশমিক ২ ও ৭ দশমিক ৫ মাত্রার ভূমিকম্প দুটি এক শতাব্দীরও বেশি সময়ের মধ্যে ভেনিজুয়েলায় আঘাত হানা সবচেয়ে শক্তিশালী। এসব ভূমিকম্প সমগ্র অঞ্চলজুড়ে অনুভূত হয়।

ভূমিকম্পে নিহত প্রায় ৬০০ জনের পাশাপাশি আরও তিন হাজার জন আহত হয়েছেন। ভেনিজুয়েলার স্বাস্থ্যমন্ত্রী কার্লোস আলভারাদোর বলেন, হাসপাতালগুলো রোগীতে পরিপূর্ণ। ধারণা করা হচ্ছে, শত শত মানুষ ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকা পড়ে রয়েছেন।

‘আমরা সবকিছু হারিয়েছি’

ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসের উত্তরে অবস্থিত উপকূলীয় রাজ্য লা গুয়াইরায় সবচেয়ে বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।

ভেনেজুয়েলার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দিওসদাদো ক্যাবেলো বলেছেন, রাজ্যটিতে ১০০টিরও বেশি ভবন ধসে পড়েছে এবং অন্তত ৭০ হাজার পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

এ অঞ্চলেই ভেনেজুয়েলার প্রধান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর রয়েছে, যা ক্ষয়ক্ষতির কারণে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

লা গুয়াইরা শহরে নিখোঁজ আত্মীয়দের খবরের অপেক্ষায় থাকা পরিবারগুলো খালি হাতে ধ্বংসস্তূপের মধ্যে খননকাজ চালাচ্ছেন।

৬৪ বছর বয়সী পেদ্রো পেরেজ গৃহসজ্জার কারখানার মালিক। তিনি বলেন, আমরা সবকিছু হারিয়েছি। আমাদের কাছে কোনো খাবার বা ওষুধ নেই। আমরা আশা করি, দ্রুত সাহায্য পৌঁছাবে।

পেরেজ জানান, তিনি তার বাড়ি ও ব্যবসা দুটোই হারিয়েছেন এবং স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে রাস্তায় রাত কাটাচ্ছেন।

কারাকাসেও ভবন ধসে পড়ার ভয়ে অনেকে রাস্তায় বা নিজেদের গাড়িতে রাত কাটিয়েছেন। কারাকাস থেকে সাংবাদদাতা মারিয়া এমিলিয়া মিরো কুয়েসাদা আল জাজিরাকে বলেন, মানুষ তাদের বাড়িতে ফিরতে ভয় পাচ্ছে। ভবনগুলোর অবস্থা ও ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে তারা খুবই অনিশ্চিত।

বছরের পর বছর ধরে চলা অর্থনৈতিক দুরবস্থা এবং দুর্বল অবকাঠামোর কারণে ভেনেজুয়েলায় উদ্ধার প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

প্রতিবেশী কলম্বিয়ার বোগোটা থেকে আল জাজিরার আলেসান্দ্রো রামপিয়েত্তি জানান, ভূমিকম্পের আগেও ভেনেজুয়েলা ‘খুবই কঠিন পরিস্থিতিতে’ ছিল, যেখানে ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাট এবং জনসেবা ব্যবস্থা ‘বিপর্যস্ত’ ছিল। অনেক হাসপাতাল আগে থেকেই তাদের ধারণক্ষমতার চেয়ে কম রোগী নিয়ে চলছিল, কারণ তাদের কাছে প্রয়োজনীয় সংখ্যক প্রকৌশলী এবং চিকিৎসক নেই।

ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা একটি ফিল্ড হাসপাতাল এবং দমকলকর্মী ও অন্যান্য সহায়ক কর্মী পাঠানোর ঘোষণা দিয়েছেন।

এল সালভাদরের প্রেসিডেন্ট নায়িব বুকেলে বলেছেন, তিনি ৩০০ জন উদ্ধারকর্মী ও প্যারামেডিক এবং ৫০ টন সরঞ্জাম, ওষুধ ও নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী প্রস্তুত রেখেছেন।

হাভানার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ব্রুনো রদ্রিগেজ বলেছেন, কিউবার স্বাস্থ্যকর্মীরা ইতোমধ্যেই ‘সম্পূর্ণরূপে ঘটনাস্থলে গিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত জনগণকে চিকিৎসা সেবা প্রদান করছেন’।

মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট ক্লডিয়া শেইনবাম বলেছেন, তার দেশ উদ্ধারকারী ও চিকিৎসা কর্মীদের একটি সামরিক দল পাঠাচ্ছে এবং প্রয়োজনে আরও সহায়তা পাঠাবে।

প্রতিবেশী কলম্বিয়া ১২ টন মানবিক সহায়তা পাঠাবে বলে দেশটির দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থা জানিয়েছে।

আমেরিকার প্রতিক্রিয়া ‘অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ’

যুক্তরাষ্ট্র গত জানুয়ারিতে সামরিক অভিযান চালিয়ে ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে অপহরণ করে নিয়ে যায়। তবে তারা দেশটিকে সর্বাত্মক সহায়তা প্রদানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এর মধ্যে যুদ্ধজাহাজ, পরিবহণ বিমান ও হেলিকপ্টার মোতায়েনের পাশাপাশি ১৫০ মিলিয়ন ডলারের সহায়তা তহবিল সংগ্রহের পরিকল্পনাও রয়েছে।

মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেছেন, এই সহায়তা হবে ‘বিশাল… দ্রুত এবং… কার্যকর’।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

MD Ayan

ভেনিজুয়েলায় ভূমিকম্পে নিহত বেড়ে ৫৮৯

Update Time : ১০:৩৮:০৭ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৬ জুন ২০২৬

ভেনিজুয়েলায় গত বুধবারের (২৪ জুন) দুটি বিধ্বংসী ভূমিকম্পে ধসে পড়া ভবনের ধ্বংসস্তূপের ভেতরে বহু মানুষ আটকা পড়ে রয়েছেন। সেখানে জীবিতদের সন্ধানে চলমান জরুরি উদ্ধার অভিযানে যোগ দিয়েছে আন্তর্জাতিক উদ্ধারকারী দলগুলো। এর মধ্যে ব্রাজিল, কানাডা, মেক্সিকো, কলম্বিয়া, এল সালভাদর, কিউবা ও যুক্তরাষ্ট্র দেশটিতে উদ্ধারকারী দল পাঠিয়েছে। আজ শুক্রবারও (২৬ জুন) দেশটিতে অনুসন্ধান ও উদ্ধারকারী দল এবং মানবিক সহায়তা পাঠানো অব্যাহত রয়েছে। ভূমিকম্পে নিহত বেড়ে ৫৮৯ জনে দাঁড়িয়েছে বলে জানান দেশটির কর্মকর্তারা। খবর আলজাজিরার।

জাতিসংঘের ত্রাণ বিষয়ক সংস্থার প্রধান টম ফ্লেচার বলেছেন, ভেনেজুয়েলার জনগণ এবং যাদের স্বজনরা ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে রয়েছেন, জেনে রাখুন আমরা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ—আপনাদের কাছে সাহায্য পৌঁছাবে।

গত বুধবারের ৭ দশমিক ২ ও ৭ দশমিক ৫ মাত্রার ভূমিকম্প দুটি এক শতাব্দীরও বেশি সময়ের মধ্যে ভেনিজুয়েলায় আঘাত হানা সবচেয়ে শক্তিশালী। এসব ভূমিকম্প সমগ্র অঞ্চলজুড়ে অনুভূত হয়।

ভূমিকম্পে নিহত প্রায় ৬০০ জনের পাশাপাশি আরও তিন হাজার জন আহত হয়েছেন। ভেনিজুয়েলার স্বাস্থ্যমন্ত্রী কার্লোস আলভারাদোর বলেন, হাসপাতালগুলো রোগীতে পরিপূর্ণ। ধারণা করা হচ্ছে, শত শত মানুষ ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকা পড়ে রয়েছেন।

‘আমরা সবকিছু হারিয়েছি’

ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসের উত্তরে অবস্থিত উপকূলীয় রাজ্য লা গুয়াইরায় সবচেয়ে বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।

ভেনেজুয়েলার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দিওসদাদো ক্যাবেলো বলেছেন, রাজ্যটিতে ১০০টিরও বেশি ভবন ধসে পড়েছে এবং অন্তত ৭০ হাজার পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

এ অঞ্চলেই ভেনেজুয়েলার প্রধান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর রয়েছে, যা ক্ষয়ক্ষতির কারণে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

লা গুয়াইরা শহরে নিখোঁজ আত্মীয়দের খবরের অপেক্ষায় থাকা পরিবারগুলো খালি হাতে ধ্বংসস্তূপের মধ্যে খননকাজ চালাচ্ছেন।

৬৪ বছর বয়সী পেদ্রো পেরেজ গৃহসজ্জার কারখানার মালিক। তিনি বলেন, আমরা সবকিছু হারিয়েছি। আমাদের কাছে কোনো খাবার বা ওষুধ নেই। আমরা আশা করি, দ্রুত সাহায্য পৌঁছাবে।

পেরেজ জানান, তিনি তার বাড়ি ও ব্যবসা দুটোই হারিয়েছেন এবং স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে রাস্তায় রাত কাটাচ্ছেন।

কারাকাসেও ভবন ধসে পড়ার ভয়ে অনেকে রাস্তায় বা নিজেদের গাড়িতে রাত কাটিয়েছেন। কারাকাস থেকে সাংবাদদাতা মারিয়া এমিলিয়া মিরো কুয়েসাদা আল জাজিরাকে বলেন, মানুষ তাদের বাড়িতে ফিরতে ভয় পাচ্ছে। ভবনগুলোর অবস্থা ও ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে তারা খুবই অনিশ্চিত।

বছরের পর বছর ধরে চলা অর্থনৈতিক দুরবস্থা এবং দুর্বল অবকাঠামোর কারণে ভেনেজুয়েলায় উদ্ধার প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

প্রতিবেশী কলম্বিয়ার বোগোটা থেকে আল জাজিরার আলেসান্দ্রো রামপিয়েত্তি জানান, ভূমিকম্পের আগেও ভেনেজুয়েলা ‘খুবই কঠিন পরিস্থিতিতে’ ছিল, যেখানে ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাট এবং জনসেবা ব্যবস্থা ‘বিপর্যস্ত’ ছিল। অনেক হাসপাতাল আগে থেকেই তাদের ধারণক্ষমতার চেয়ে কম রোগী নিয়ে চলছিল, কারণ তাদের কাছে প্রয়োজনীয় সংখ্যক প্রকৌশলী এবং চিকিৎসক নেই।

ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা একটি ফিল্ড হাসপাতাল এবং দমকলকর্মী ও অন্যান্য সহায়ক কর্মী পাঠানোর ঘোষণা দিয়েছেন।

এল সালভাদরের প্রেসিডেন্ট নায়িব বুকেলে বলেছেন, তিনি ৩০০ জন উদ্ধারকর্মী ও প্যারামেডিক এবং ৫০ টন সরঞ্জাম, ওষুধ ও নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী প্রস্তুত রেখেছেন।

হাভানার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ব্রুনো রদ্রিগেজ বলেছেন, কিউবার স্বাস্থ্যকর্মীরা ইতোমধ্যেই ‘সম্পূর্ণরূপে ঘটনাস্থলে গিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত জনগণকে চিকিৎসা সেবা প্রদান করছেন’।

মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট ক্লডিয়া শেইনবাম বলেছেন, তার দেশ উদ্ধারকারী ও চিকিৎসা কর্মীদের একটি সামরিক দল পাঠাচ্ছে এবং প্রয়োজনে আরও সহায়তা পাঠাবে।

প্রতিবেশী কলম্বিয়া ১২ টন মানবিক সহায়তা পাঠাবে বলে দেশটির দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থা জানিয়েছে।

আমেরিকার প্রতিক্রিয়া ‘অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ’

যুক্তরাষ্ট্র গত জানুয়ারিতে সামরিক অভিযান চালিয়ে ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে অপহরণ করে নিয়ে যায়। তবে তারা দেশটিকে সর্বাত্মক সহায়তা প্রদানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এর মধ্যে যুদ্ধজাহাজ, পরিবহণ বিমান ও হেলিকপ্টার মোতায়েনের পাশাপাশি ১৫০ মিলিয়ন ডলারের সহায়তা তহবিল সংগ্রহের পরিকল্পনাও রয়েছে।

মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেছেন, এই সহায়তা হবে ‘বিশাল… দ্রুত এবং… কার্যকর’।