বুধবার, ২৯ জুলাই ২০২৬, ১৪ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

রামিসা হত্যার পর আলোচনায় রসু খাঁ, ১১ বছরেও শেষ হয়নি বিচার

রাজধানীর মিরপুরের পল্লবীতে সম্প্রতি আট বছরের শিশু রামিসাকে ধর্ষণের পর গলা কেটে হত্যার ঘটনায় আলোচনায় আসে ‘সিরিয়াল কিলার’ রসু খাঁ। নিম্ন আদালতে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ হলেও দীর্ঘ ১১ বছরেও শেষ হয়নি বিচার প্রক্রিয়া। আর এমন ঘটনা রামিসাসহ অন্য হত্যাকাণ্ডের রায় নিয়ে শঙ্কার সৃষ্টি করেছে।

১১ নারীকে হত্যা এবং হত্যার আগে ধর্ষণের মতো অপরাধের অভিযোগ রয়েছে রসু খাঁর বিরুদ্ধে।

এখন থেকে ১১ বছর আগে, ২০১৫ সালে অধস্তন আদালতে ধর্ষণ ও হত্যার একটি মামলায় সাজা হয়েছিল তার। ওই ঘটনার ৯ বছর পর ২০২৪ সালে উচ্চ আদালতেও তার মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখা হয়েছিল।

ওই সময়ে দেশের সংবাদ মাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়, হাইকোর্টের রায়ের পর্যবেক্ষণে তাকে ‘সিরিয়াল কিলার’ হিসেবে অভিহিত করা হয়। তিনি আইনের অনুকম্পা পাওয়ার যোগ্য নন, সর্বোচ্চ শাস্তিই তার প্রাপ্য বলেও উল্লেখ করা হয়। এরপর আরও প্রায় দুই বছর পার হলেও এখনো অনুষ্ঠিত হয়নি আপিল শুনানি, ফলে সাজাও কার্যকর হয়নি।

যেভাবে ধরা পড়ে রসু খাঁ

 

রসু খাঁ চাঁদপুর সদর উপজেলার চান্দ্রা ইউনিয়নের মদনা গ্রামের মুন খাঁ ওরফে আবু খার ছেলে। আর জহিরুল পাশের ফরিদগঞ্জ উপজেলার গোবিন্দপুর গ্রামের মো. মোস্তাফার ছেলে এবং ইউনুস একই গ্রামের মৃত মিসির আলীর ছেলে।

২০০৯ সালের ৭ অক্টোবর মসজিদের ফ্যান চুরির ঘটনায় টঙ্গী থেকে রসু খাঁকে গ্রেফতার করা হয়। পরে তার মোবাইল ফোনের সূত্রে স্থানীয় এক কিশোরী হত্যার ঘটনায় জড়িত থাকার সন্দেহে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে পুলিশ। রিমান্ডে মুখ খোলেন রসু খাঁ। যেখানে বেরিয়ে আসে গা শিউরে ওঠা তার সব ধর্ষণ ও খুনের ঘটনা। রিমান্ড শেষে আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দিতে রসু খার ১১টি খুনের কথা উঠে আসে।

নিম্ন আদালতে রসু খাঁ’র মৃত্যুদণ্ডের আদেশ

রসু খাঁর বিরুদ্ধে করা মামলাগুলোর মধ্যে খুলনার পোশাককর্মী শাহিদা হত্যা মামলায় প্রথম মৃত্যুদণ্ডের রায় আসে ২০১৫ সালের ২২ এপ্রিল। চাঁদপুরের অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ অরুণাভ চক্রবর্তী রসু খাঁর মৃত্যুদণ্ডের রায় দেন।

 

২০০৯ সালের ২০ জুলাই রাতে রসু খাঁ ও অপর আসামিরা ফরিদগঞ্জ উপজেলার মধ্য হাঁসা গ্রামের নির্জন মাঠে পারভীন আক্তার নামে এক নারীকে ধর্ষণ এবং শ্বাসরোধ করে হত্যা করে। এই মামলায় চাঁদপুরের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আদালতের বিচারক আবদুল মান্নান ২০১৮ সালের ৬ মার্চ রসু খাঁ ও তার ভাগনে জহিরুল ইসলামসহ তিনজনকে মৃত্যুদণ্ড দেন। পরে এই রায়ের ডেথ রেফারেন্স শুনানির জন্য হাইকোর্টে আসে।

 

বিচার শেষ কবে

 

আইন অনুযায়ী, হাইকোর্টের রায়ের পরও মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত কোনো আসামির ফাঁসি কার্যকর করার আগে বেশ কিছু দীর্ঘ ও আইনি ধাপ রয়েছে। যেগুলো শেষ না হলে ফাঁসি কার্যকরের সুযোগ নেই। আইনজীবীরা বলছেন, নিম্ন আদালত এবং হাইকোর্টে ফাঁসির রায় বহাল ছিল রসু খাঁর। কিন্তু নিয়মানুযায়ী আসামিপক্ষ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে আপিল করার সুযোগ পান।

 

আইনজীবী মনজিল মোরসেদ গণমাধ্যমকে জানান, মামলার পেপারবুক না হলে শুনানি হবে না। এই পেপারবুক তৈরি করতে সময় লাগতে পারে অনেকদিন। এটা করতে কখনো কখনো ১০ বছরও লাগতে পারে। আর এই পেপারবুকের কাজটি করে সরকার। যে কারণে কবে সেটি হবে এটি নির্ভর করছে সরকারের ওপর।
 
এদিকে মৃত্যুদণ্ডের সাজার ক্ষেত্রে আপিল বিভাগ যদি নিম্ন আদালত ও হাইকোর্টের রায় বহাল রাখে, তারপরও রিভিউ আবেদন করার সুযোগ পায় আসামি।
 
রসু খাঁ’র বিরুদ্ধে আরেকটি হত্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন নিম্ন আদালত। শাহিদা বেগম হত্যা মামলায় উচ্চ আদালতে এখনো আপিল শুনানি অনুষ্ঠিত হয়নি।
 
সম্প্রতি বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট ও ব্র্যাক যৌথভাবে একটি গবেষণা করেছে। যেই গবেষণায় উঠে এসেছে, অধস্তন আদালতে নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধ আইন, ২০০০ অনুযায়ী ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে মামলা নিষ্পত্তির বিধান থাকলেও বাস্তবে একটি মামলা শেষ হতে গড়ে তিন বছর সাত মাস সময় লাগছে। অনেকক্ষেত্রে এই সময় আরও বেশি লাগছে। এ অবস্থায় ভিক্টিমের পরিবারকে ন্যায়বিচার পেতে লম্বা সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে। আর এসব কারণে ন্যায়বিচার পাওয়া নিয়েও তাদের মধ্যে তৈরি হচ্ছে শঙ্কা।

 

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

MD Ayan

রামিসা হত্যার পর আলোচনায় রসু খাঁ, ১১ বছরেও শেষ হয়নি বিচার

Update Time : ১০:৫২:১৯ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৪ মে ২০২৬

রাজধানীর মিরপুরের পল্লবীতে সম্প্রতি আট বছরের শিশু রামিসাকে ধর্ষণের পর গলা কেটে হত্যার ঘটনায় আলোচনায় আসে ‘সিরিয়াল কিলার’ রসু খাঁ। নিম্ন আদালতে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ হলেও দীর্ঘ ১১ বছরেও শেষ হয়নি বিচার প্রক্রিয়া। আর এমন ঘটনা রামিসাসহ অন্য হত্যাকাণ্ডের রায় নিয়ে শঙ্কার সৃষ্টি করেছে।

১১ নারীকে হত্যা এবং হত্যার আগে ধর্ষণের মতো অপরাধের অভিযোগ রয়েছে রসু খাঁর বিরুদ্ধে।

এখন থেকে ১১ বছর আগে, ২০১৫ সালে অধস্তন আদালতে ধর্ষণ ও হত্যার একটি মামলায় সাজা হয়েছিল তার। ওই ঘটনার ৯ বছর পর ২০২৪ সালে উচ্চ আদালতেও তার মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখা হয়েছিল।

ওই সময়ে দেশের সংবাদ মাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়, হাইকোর্টের রায়ের পর্যবেক্ষণে তাকে ‘সিরিয়াল কিলার’ হিসেবে অভিহিত করা হয়। তিনি আইনের অনুকম্পা পাওয়ার যোগ্য নন, সর্বোচ্চ শাস্তিই তার প্রাপ্য বলেও উল্লেখ করা হয়। এরপর আরও প্রায় দুই বছর পার হলেও এখনো অনুষ্ঠিত হয়নি আপিল শুনানি, ফলে সাজাও কার্যকর হয়নি।

যেভাবে ধরা পড়ে রসু খাঁ

 

রসু খাঁ চাঁদপুর সদর উপজেলার চান্দ্রা ইউনিয়নের মদনা গ্রামের মুন খাঁ ওরফে আবু খার ছেলে। আর জহিরুল পাশের ফরিদগঞ্জ উপজেলার গোবিন্দপুর গ্রামের মো. মোস্তাফার ছেলে এবং ইউনুস একই গ্রামের মৃত মিসির আলীর ছেলে।

২০০৯ সালের ৭ অক্টোবর মসজিদের ফ্যান চুরির ঘটনায় টঙ্গী থেকে রসু খাঁকে গ্রেফতার করা হয়। পরে তার মোবাইল ফোনের সূত্রে স্থানীয় এক কিশোরী হত্যার ঘটনায় জড়িত থাকার সন্দেহে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে পুলিশ। রিমান্ডে মুখ খোলেন রসু খাঁ। যেখানে বেরিয়ে আসে গা শিউরে ওঠা তার সব ধর্ষণ ও খুনের ঘটনা। রিমান্ড শেষে আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দিতে রসু খার ১১টি খুনের কথা উঠে আসে।

নিম্ন আদালতে রসু খাঁ’র মৃত্যুদণ্ডের আদেশ

রসু খাঁর বিরুদ্ধে করা মামলাগুলোর মধ্যে খুলনার পোশাককর্মী শাহিদা হত্যা মামলায় প্রথম মৃত্যুদণ্ডের রায় আসে ২০১৫ সালের ২২ এপ্রিল। চাঁদপুরের অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ অরুণাভ চক্রবর্তী রসু খাঁর মৃত্যুদণ্ডের রায় দেন।

 

২০০৯ সালের ২০ জুলাই রাতে রসু খাঁ ও অপর আসামিরা ফরিদগঞ্জ উপজেলার মধ্য হাঁসা গ্রামের নির্জন মাঠে পারভীন আক্তার নামে এক নারীকে ধর্ষণ এবং শ্বাসরোধ করে হত্যা করে। এই মামলায় চাঁদপুরের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আদালতের বিচারক আবদুল মান্নান ২০১৮ সালের ৬ মার্চ রসু খাঁ ও তার ভাগনে জহিরুল ইসলামসহ তিনজনকে মৃত্যুদণ্ড দেন। পরে এই রায়ের ডেথ রেফারেন্স শুনানির জন্য হাইকোর্টে আসে।

 

বিচার শেষ কবে

 

আইন অনুযায়ী, হাইকোর্টের রায়ের পরও মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত কোনো আসামির ফাঁসি কার্যকর করার আগে বেশ কিছু দীর্ঘ ও আইনি ধাপ রয়েছে। যেগুলো শেষ না হলে ফাঁসি কার্যকরের সুযোগ নেই। আইনজীবীরা বলছেন, নিম্ন আদালত এবং হাইকোর্টে ফাঁসির রায় বহাল ছিল রসু খাঁর। কিন্তু নিয়মানুযায়ী আসামিপক্ষ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে আপিল করার সুযোগ পান।

 

আইনজীবী মনজিল মোরসেদ গণমাধ্যমকে জানান, মামলার পেপারবুক না হলে শুনানি হবে না। এই পেপারবুক তৈরি করতে সময় লাগতে পারে অনেকদিন। এটা করতে কখনো কখনো ১০ বছরও লাগতে পারে। আর এই পেপারবুকের কাজটি করে সরকার। যে কারণে কবে সেটি হবে এটি নির্ভর করছে সরকারের ওপর।
 
এদিকে মৃত্যুদণ্ডের সাজার ক্ষেত্রে আপিল বিভাগ যদি নিম্ন আদালত ও হাইকোর্টের রায় বহাল রাখে, তারপরও রিভিউ আবেদন করার সুযোগ পায় আসামি।
 
রসু খাঁ’র বিরুদ্ধে আরেকটি হত্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন নিম্ন আদালত। শাহিদা বেগম হত্যা মামলায় উচ্চ আদালতে এখনো আপিল শুনানি অনুষ্ঠিত হয়নি।
 
সম্প্রতি বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট ও ব্র্যাক যৌথভাবে একটি গবেষণা করেছে। যেই গবেষণায় উঠে এসেছে, অধস্তন আদালতে নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধ আইন, ২০০০ অনুযায়ী ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে মামলা নিষ্পত্তির বিধান থাকলেও বাস্তবে একটি মামলা শেষ হতে গড়ে তিন বছর সাত মাস সময় লাগছে। অনেকক্ষেত্রে এই সময় আরও বেশি লাগছে। এ অবস্থায় ভিক্টিমের পরিবারকে ন্যায়বিচার পেতে লম্বা সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে। আর এসব কারণে ন্যায়বিচার পাওয়া নিয়েও তাদের মধ্যে তৈরি হচ্ছে শঙ্কা।