শনিবার, ১৩ জুন ২০২৬, ৩০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

খামারে গিয়ে কেন কোরবানির গরু কিনছেন ক্রেতারা

  • Reporter Name
  • Update Time : ০২:৪৭:৪৮ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৫ মে ২০২৬
  • ৮ Time View

 

ঈদের এখনো চার দিন বাকি। অথচ চট্টগ্রামের অনেক বড় খামারে গরুর সারি ফাঁকা হতে শুরু করেছে। কোথাও হাতে গোনা কয়েকটি গরু অবশিষ্ট। কোথাও চলছে শেষ মুহূর্তের দরদাম।

খামারিরা বলছেন, এবার আগেভাগেই জমে উঠেছে বেচাকেনা। অনেকে এক মাস আগে গরু পছন্দ করে গেছেন। কেউ বায়না করেছেন। কেউ পুরো টাকা পরিশোধও করেছেন। ঈদের আগের দিন খামার থেকেই পৌঁছে দেওয়া হবে পশু।

জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তার কার্যালয় বলছে, চট্টগ্রাম নগরে ছোট-বড় মিলিয়ে অর্ধশতাধিক খামার রয়েছে। এসব খামারে এবার ১০ থেকে ১৫ হাজার পশু বিক্রি হবে।

গতকাল রোববার বিকেলে নগরের বায়েজিদ এলাকার চৌধুরী র‍্যাঞ্চে গিয়ে দেখা যায়, খামারজুড়ে শান্ত পরিবেশ, গোছানো শেড, পরিচ্ছন্ন উঠান। কর্মচারীরা ব্যস্ত গরুর পরিচর্যায়। কেউ খাবার দিচ্ছেন, কেউ পরিষ্কার করছেন শেড। এক পাশে কয়েকজন ক্রেতা গরু দেখছিলেন। শিশুদের কেউ গরুর গায়ে হাত বুলিয়ে দিচ্ছিল। কেউ মুঠোফোনে ছবি তুলছিলেন।

খামারটিতে এবার ১৩৩টি গরু প্রস্তুত করা হয়েছিল। ইতিমধ্যে ৯০ শতাংশ গরুই বিক্রি হয়ে গেছে। চৌধুরী র‍্যাঞ্চের কর্ণধার রাশেদ চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, ‘এবারও আগেভাগেই বিক্রি শুরু হয়েছে। মানুষ এখন শেষ মুহূর্তের ঝামেলা এড়াতে চান, তাই আগে থেকেই গরু কিনে রাখছেন। আমরা কম বাজেটের ক্রেতাদের কথাও মাথায় রেখেছি। ৮০ হাজার থেকে ২ লাখ টাকার মধ্যে বেশি গরু ছিল। সাড়াও ভালো পেয়েছি।’

খামারে গরু কিনতে এসেছিলেন নগরের অক্সিজেন এলাকার বাসিন্দা মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম। স্ত্রী ও সন্তানকে নিয়ে ঘুরে ঘুরে গরু দেখছিলেন তিনি। সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘হাটে গেলে ভিড় অনেক বেশি থাকে। বাচ্চাদের নিয়ে কষ্ট হয়। এখানে শান্তিতে সময় নিয়ে গরু দেখা যায়। গতবারও এই খামার থেকে গরু কিনেছিলাম। তাই এবারও এসেছি।’

পবিত্র ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে চট্টগ্রাম নগরের বায়েজিদ টেক্সটাইল এলাকার একটি অ্যাগ্রো ফার্মে গরু দেখতে এসেছেন কয়েকজন ক্রেতা। গতকাল বিকেল তিনটায়ছবি: জুয়েল শীল

এখন আছে মাত্র ৮টি গরু

নগরের বায়েজিদ লিংক রোড ধরে একটু এগোলে পাহাড়ঘেরা পরিবেশে দেখা মেলে নাহার অ্যাগ্রোর। সবুজের মধ্যে গড়ে ওঠা খামারটিতে এবার ঈদ উপলক্ষে ৫৫০টি গরু প্রস্তুত করা হয়েছিল। এখন অবশিষ্ট মাত্র আটটি। খামারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রাকিবুর রহমান বলেন, দুই মাস আগ থেকেই বিক্রি শুরু হয়েছে। এবার পুরোনো ক্রেতাদের পাশাপাশি নতুন অনেক ক্রেতাও এসেছেন। পরিবার নিয়ে এসে দেখেশুনে গরু কিনছেন। তিনি বলেন, ‘আমরা প্রাকৃতিক খাবারে গরু বড় করি। মোটাতাজাকরণের কোনো বাড়তি পদ্ধতি ব্যবহার করি না। এ কারণে মানুষ আস্থা পাচ্ছেন।’

নগরের উত্তর কাট্টলির সিটি অ্যাগ্রোতে এখন শেষ দফার বিক্রি চলছে। এবার সেখানে ১৫০টির মতো গরু প্রস্তুত করা হয়েছিল। ইতিমধ্যে ৯৫ শতাংশ গরু বিক্রি হয়ে গেছে। চট্টগ্রামের বড় খামারগুলোর মধ্যে সারা অ্যাগ্রোর বিক্রিও প্রায় শেষ। এবার তারা ৫৫০টি গরু তুলেছিল। এখন আছে মাত্র ২৪টি। খামারটির কর্ণধার আলিফ চৌধুরী বলেন, ‘খরচ কিছুটা বেড়েছে। খাবারের দামও বাড়তি। তার পরও আমরা চেষ্টা করেছি দাম হাতের নাগালে রাখতে।’

এবার সারা অ্যাগ্রোতে সবচেয়ে বড় গরুটি ছিল শাহিওয়াল জাতের। ওজন প্রায় ৯০০ কেজি। সেটি বিক্রি হয়েছে ১২ লাখ টাকায়। বায়েজিদ এলাকার এশিয়ান অ্যাগ্রোতে গিয়ে মাত্র পাঁচটি গরু পাওয়া গেল। সেখানে তিন শতাধিক গরু উঠেছিল। ফলে তাদেরও বিক্রি প্রায় শেষের দিকে। এই খামারে গতকাল গরু দেখতে এসেছিলেন সানমার প্রপার্টিজের সহকারী মহাব্যবস্থাপক মাইনুল হক। তিনি একটি গরু পছন্দ করেন।

কেন বাড়ছে খামারমুখী ক্রেতা

চট্টগ্রামে কোরবানির পশু কেনার ধরন এখন বদলে যাচ্ছে। কয়েক বছর আগেও অধিকাংশ মানুষ নির্ভর করতেন সাগরিকা, বিবিরহাট কিংবা অস্থায়ী পশুর হাটের ওপর। এখন ধীরে ধীরে সেই জায়গা নিচ্ছে খামার। এর পেছনে কয়েকটি কারণ রয়েছে। প্রথমত, খামারে ভিড় কম। কাদা, যানজট ও ঠেলাঠেলির ঝামেলা নেই। পরিবার নিয়ে গিয়ে নিশ্চিন্তে গরু দেখা যায়।

দ্বিতীয়ত, পরিচিত খামার থেকে গরু কিনলে ক্রেতাদের মধ্যে আস্থা তৈরি হয়। কী খাবার খাইয়ে গরু বড় করা হয়েছে, সেটিও জানতে পারছেন তাঁরা। ফলে মাংসের মান নিয়েও বাড়তি প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে।

তৃতীয়ত, নগরের বেশির ভাগ বাসাবাড়িতে এখন গরু রাখার জায়গা নেই। আবার গরু দেখভালের মানুষও কমে গেছে। ফলে অনেকে আগেভাগে গরু কিনে খামারেই রেখে দিচ্ছেন। ঈদের আগের দিন খামার থেকেই পশু পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে বাসায়।

খামারভিত্তিক বিক্রি বাড়ার আরেকটি কারণ অনলাইন প্রচার। ফেসবুক লাইভ, ভিডিও ও ছবির মাধ্যমে আগে থেকেই গরু দেখে রাখছেন ক্রেতারা। পরে খামারে এসে সরাসরি দেখে কিনছেন। এতে সময়ও বাঁচছে।

জানতে চাইলে জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা মো. আলমগীর প্রথম আলোকে বলেন, খামারভিত্তিক বিক্রি এখন অনেক বেড়েছে। মানুষ আগেভাগে গরু কিনে রাখছেন। এতে শেষ মুহূর্তের চাপও কমছে।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

খামারে গিয়ে কেন কোরবানির গরু কিনছেন ক্রেতারা

Update Time : ০২:৪৭:৪৮ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৫ মে ২০২৬

 

ঈদের এখনো চার দিন বাকি। অথচ চট্টগ্রামের অনেক বড় খামারে গরুর সারি ফাঁকা হতে শুরু করেছে। কোথাও হাতে গোনা কয়েকটি গরু অবশিষ্ট। কোথাও চলছে শেষ মুহূর্তের দরদাম।

খামারিরা বলছেন, এবার আগেভাগেই জমে উঠেছে বেচাকেনা। অনেকে এক মাস আগে গরু পছন্দ করে গেছেন। কেউ বায়না করেছেন। কেউ পুরো টাকা পরিশোধও করেছেন। ঈদের আগের দিন খামার থেকেই পৌঁছে দেওয়া হবে পশু।

জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তার কার্যালয় বলছে, চট্টগ্রাম নগরে ছোট-বড় মিলিয়ে অর্ধশতাধিক খামার রয়েছে। এসব খামারে এবার ১০ থেকে ১৫ হাজার পশু বিক্রি হবে।

গতকাল রোববার বিকেলে নগরের বায়েজিদ এলাকার চৌধুরী র‍্যাঞ্চে গিয়ে দেখা যায়, খামারজুড়ে শান্ত পরিবেশ, গোছানো শেড, পরিচ্ছন্ন উঠান। কর্মচারীরা ব্যস্ত গরুর পরিচর্যায়। কেউ খাবার দিচ্ছেন, কেউ পরিষ্কার করছেন শেড। এক পাশে কয়েকজন ক্রেতা গরু দেখছিলেন। শিশুদের কেউ গরুর গায়ে হাত বুলিয়ে দিচ্ছিল। কেউ মুঠোফোনে ছবি তুলছিলেন।

খামারটিতে এবার ১৩৩টি গরু প্রস্তুত করা হয়েছিল। ইতিমধ্যে ৯০ শতাংশ গরুই বিক্রি হয়ে গেছে। চৌধুরী র‍্যাঞ্চের কর্ণধার রাশেদ চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, ‘এবারও আগেভাগেই বিক্রি শুরু হয়েছে। মানুষ এখন শেষ মুহূর্তের ঝামেলা এড়াতে চান, তাই আগে থেকেই গরু কিনে রাখছেন। আমরা কম বাজেটের ক্রেতাদের কথাও মাথায় রেখেছি। ৮০ হাজার থেকে ২ লাখ টাকার মধ্যে বেশি গরু ছিল। সাড়াও ভালো পেয়েছি।’

খামারে গরু কিনতে এসেছিলেন নগরের অক্সিজেন এলাকার বাসিন্দা মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম। স্ত্রী ও সন্তানকে নিয়ে ঘুরে ঘুরে গরু দেখছিলেন তিনি। সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘হাটে গেলে ভিড় অনেক বেশি থাকে। বাচ্চাদের নিয়ে কষ্ট হয়। এখানে শান্তিতে সময় নিয়ে গরু দেখা যায়। গতবারও এই খামার থেকে গরু কিনেছিলাম। তাই এবারও এসেছি।’

পবিত্র ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে চট্টগ্রাম নগরের বায়েজিদ টেক্সটাইল এলাকার একটি অ্যাগ্রো ফার্মে গরু দেখতে এসেছেন কয়েকজন ক্রেতা। গতকাল বিকেল তিনটায়ছবি: জুয়েল শীল

এখন আছে মাত্র ৮টি গরু

নগরের বায়েজিদ লিংক রোড ধরে একটু এগোলে পাহাড়ঘেরা পরিবেশে দেখা মেলে নাহার অ্যাগ্রোর। সবুজের মধ্যে গড়ে ওঠা খামারটিতে এবার ঈদ উপলক্ষে ৫৫০টি গরু প্রস্তুত করা হয়েছিল। এখন অবশিষ্ট মাত্র আটটি। খামারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রাকিবুর রহমান বলেন, দুই মাস আগ থেকেই বিক্রি শুরু হয়েছে। এবার পুরোনো ক্রেতাদের পাশাপাশি নতুন অনেক ক্রেতাও এসেছেন। পরিবার নিয়ে এসে দেখেশুনে গরু কিনছেন। তিনি বলেন, ‘আমরা প্রাকৃতিক খাবারে গরু বড় করি। মোটাতাজাকরণের কোনো বাড়তি পদ্ধতি ব্যবহার করি না। এ কারণে মানুষ আস্থা পাচ্ছেন।’

নগরের উত্তর কাট্টলির সিটি অ্যাগ্রোতে এখন শেষ দফার বিক্রি চলছে। এবার সেখানে ১৫০টির মতো গরু প্রস্তুত করা হয়েছিল। ইতিমধ্যে ৯৫ শতাংশ গরু বিক্রি হয়ে গেছে। চট্টগ্রামের বড় খামারগুলোর মধ্যে সারা অ্যাগ্রোর বিক্রিও প্রায় শেষ। এবার তারা ৫৫০টি গরু তুলেছিল। এখন আছে মাত্র ২৪টি। খামারটির কর্ণধার আলিফ চৌধুরী বলেন, ‘খরচ কিছুটা বেড়েছে। খাবারের দামও বাড়তি। তার পরও আমরা চেষ্টা করেছি দাম হাতের নাগালে রাখতে।’

এবার সারা অ্যাগ্রোতে সবচেয়ে বড় গরুটি ছিল শাহিওয়াল জাতের। ওজন প্রায় ৯০০ কেজি। সেটি বিক্রি হয়েছে ১২ লাখ টাকায়। বায়েজিদ এলাকার এশিয়ান অ্যাগ্রোতে গিয়ে মাত্র পাঁচটি গরু পাওয়া গেল। সেখানে তিন শতাধিক গরু উঠেছিল। ফলে তাদেরও বিক্রি প্রায় শেষের দিকে। এই খামারে গতকাল গরু দেখতে এসেছিলেন সানমার প্রপার্টিজের সহকারী মহাব্যবস্থাপক মাইনুল হক। তিনি একটি গরু পছন্দ করেন।

কেন বাড়ছে খামারমুখী ক্রেতা

চট্টগ্রামে কোরবানির পশু কেনার ধরন এখন বদলে যাচ্ছে। কয়েক বছর আগেও অধিকাংশ মানুষ নির্ভর করতেন সাগরিকা, বিবিরহাট কিংবা অস্থায়ী পশুর হাটের ওপর। এখন ধীরে ধীরে সেই জায়গা নিচ্ছে খামার। এর পেছনে কয়েকটি কারণ রয়েছে। প্রথমত, খামারে ভিড় কম। কাদা, যানজট ও ঠেলাঠেলির ঝামেলা নেই। পরিবার নিয়ে গিয়ে নিশ্চিন্তে গরু দেখা যায়।

দ্বিতীয়ত, পরিচিত খামার থেকে গরু কিনলে ক্রেতাদের মধ্যে আস্থা তৈরি হয়। কী খাবার খাইয়ে গরু বড় করা হয়েছে, সেটিও জানতে পারছেন তাঁরা। ফলে মাংসের মান নিয়েও বাড়তি প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে।

তৃতীয়ত, নগরের বেশির ভাগ বাসাবাড়িতে এখন গরু রাখার জায়গা নেই। আবার গরু দেখভালের মানুষও কমে গেছে। ফলে অনেকে আগেভাগে গরু কিনে খামারেই রেখে দিচ্ছেন। ঈদের আগের দিন খামার থেকেই পশু পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে বাসায়।

খামারভিত্তিক বিক্রি বাড়ার আরেকটি কারণ অনলাইন প্রচার। ফেসবুক লাইভ, ভিডিও ও ছবির মাধ্যমে আগে থেকেই গরু দেখে রাখছেন ক্রেতারা। পরে খামারে এসে সরাসরি দেখে কিনছেন। এতে সময়ও বাঁচছে।

জানতে চাইলে জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা মো. আলমগীর প্রথম আলোকে বলেন, খামারভিত্তিক বিক্রি এখন অনেক বেড়েছে। মানুষ আগেভাগে গরু কিনে রাখছেন। এতে শেষ মুহূর্তের চাপও কমছে।