সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের আইন উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. আসিফ নজরুল বলেছেন, মানুষের জীবন আর সর্বস্ব লুটে খাওয়া পিশাচের বিরুদ্ধে জীবনপণ লড়াইয়ে কারিনা ছিল আমাদের সঙ্গে।
শনিবার (১৬ মে) নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক আইডির এক পোস্টে তিনি এ কথা বলেন।
আসিফ নজরুল বলেন, সকালবেলা আমার স্ত্রী বলল, কারিনা মারা গেছে। মনটা খারাপ লাগছে। আমি লম্বালম্বি হয়ে শুয়ে থাকি সকালে কিছুক্ষণ। পায়ের কাছে জানালা, জানালার পেছনে নিথর হয়ে থাকা রোদ। বাতাস নেই বলে রোদটা নড়ে না একটুও। ফুলার রোডে আমাদের আগের বাসায় এর চেয়েও সুন্দর একটা জানালা ছিল। তেজপাতা, সজনে, নারকেল, আম আর বকুল গাছগুলো আলাদাভাবে দেখতাম। সবার সবুজ কেমন আলাদা, একই বাতাসে সবার আনন্দ আলাদা, আকাশের দিকে যে তাকিয়ে থাকা সেটাও আলাদা।
তিনি বলেন, এসব সবুজের পেছনে অনেক দূরে কৃষ্ণচূড়ার নরম লাল ছোপ। উপরে মুনি-ঋষির মতো উদাস আকাশ। দূরের আকাশে স্থির হয়ে থাকা চিল, মাঝামাঝি জানালায় ভীষণ বিরক্ত কাক, উথাল-পাথাল একটা ছোট্ট পাখি। জানালার ঠিক সামনে সুপারি গাছের সারি। নিচে প্রতিদিনের অক্লান্ত কাঠঠোকরার ডাক। এখনকার জানালাটা আগের মতো না। কয়েকটা মাত্র কাঁঠালগাছ, নিচু হয়ে হাত নাড়তে থাকা নাম না-জানা গাছ, একটু উঁচু হয়ে বসলে স্যাতসেঁতে গ্যারেজের ছাদে ঝিরিঝিরি পাতার ঝোপ। গাছগাছালির পেছনে অনেক দিন পরে আবিষ্কার করা নিচু একটা দেয়াল। তার সামনে দিয়ে অনেকক্ষণ পরপর হেঁটে যায় কেউ, আরও পরে কোনো একটা সাইকেল।
আসিফ নজরুল লেখেন, সেই দেয়ালজুড়ে এঁকে রাখা জুলাইয়ের ছবি। ছবিতে অনেক রং, লাল রং। আজ লাল রংটা চোখে পড়ল বেশি। মনেও থাকল বেশি।
একটু আগে কারিনার চলে যাওয়ার খবর শুনেছি। লাল জুলাইয়ের রং। কারিনা জুলাইয়ের নাম। আরও অনেক জুলাইয়ে ওর কি থাকার কথা ছিল না মামদের সাথে!
আসিফ নজরুল আরও বলেন, রোদ চড়া হলে কাজে রওনা দিলাম। দূরের পথে কত কিছু মনে পড়ল জুলাইয়ের। স্লোগান, ঘাম, গুলি, রক্ত, হেলিকপ্টার, ব্যারিকেড, উল্লাস! জুলাইয়ের সন্তানদের মুখ! আবু সাঈদের চিতানো বুক, এপিসি থেকে ইয়ামীনের স্লো-মোশনে লুটিয়ে পড়া দেহ, আনাসের শেষ চিঠি। আরও কতো কতো মানুষ, কতো স্মৃতি!
তিনি বলেন, আমরা জুলাইয়ের পরিবার। দেখা হয়নি, পরিচয় নেই, রক্তের সম্পর্ক নেই, তবু আমরা একটা পরিবার। দূরে থাকি, ভুলে থাকি, নীরব থাকি, তবু আমরা একটা পরিবার। ভুল বুঝি, ঝগড়া করি, তবু আমরা একটা পরিবার।
পোস্টের শেষে তিনি বলেন, আমাদের পরিবারের একজন চলে গেছে অকালে! মানুষের জীবন আর সর্বস্ব লুটে খাওয়া পিশাচের বিরুদ্ধে জীবনপণ লড়াইয়ে সে ছিল আমাদের সঙ্গে। মানুষের মুক্তির জন্য। মানুষই তাই মনে রাখবে তাকে। স্নেহে, ভালোবাসায়; দোয়ায়, প্রার্থনায়।
নিজস্ব প্রতিবেদক 















