বুধবার, ২৯ জুলাই ২০২৬, ১৪ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শিশু রামিসা হত্যা, যুবলীগ কর্মী সোহেল রানার মৃত্যুদণ্ড চান স্বজনরা

রাজধানীর পল্লবীতে দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী রামিসা আক্তার হত্যা মামলার প্রধান আসামি যুবলীগ কর্মী সোহেল রানাকে ঘিরে সামনে এসেছে অতীত জীবনের নানা অপকর্মের তথ্য।

রানার জন্ম ও বেড়ে ওঠা নাটোরের সিংড়া উপজেলার কলম ইউনিয়নের মহেষচন্দ্রপুর গ্রামে। চার বছর আগে প্রথম স্ত্রীর সঙ্গে বিচ্ছেদের পর তিনি দ্বিতীয় বিয়ে করে সেই স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে ঢাকায় বসবাস শুরু করেন। এরপর থেকে গ্রামে পরিবারের সঙ্গে তার যোগাযোগ প্রায় বিচ্ছিন্ন ছিল।

শুক্রবার (২২ মে) সকালে মহেষচন্দ্রপুর গ্রামে গিয়ে কথা হয় সোহেল রানার বাবা-মাসহ পরিবারের সদস্য ও স্বজনদের সঙ্গে। যুবলীগ কর্মী সোহেল রানার এমন অপকর্মের জন্য তার সর্বোচ্চ শাস্তি চেয়েছেন তার বাবা-মা, বোনসহ পরিবারের সদস্যরাও।

প্রতিবেশী স্থানীয় সাবেক পৌর কাউন্সিলর মহিদুল ইসলাম বলেন, ছোটবেলায় সবাই তাকে রানা নামে ডাকত। প্রাথমিকের গণ্ডি পেরিয়ে তার আর লেখাপড়া হয়নি। তরুণ বয়সে স্থানীয় আওয়ামী যুবলীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে ব্যাপক পরিচিতি পায়। তখন তিনি নিজেকে এসএম রানা বলে পরিচয় দিতেন এবং পরিচিতি বাড়াতে স্থানীয় বাজারে যুবলীগ কর্মী পরিচয়ে বিলবোর্ডও দেন।

সেই সময় কলম ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক ওয়ার্ড সদস্য রফিকুল ইসলামের (মেম্বার) ডান হাত হিসেবে এলাকায় নানা অপকর্মে জড়িয়ে পড়েন। স্থানীয় একটি সেতুর নির্মাণ সামগ্রী ও রড চুরির মামলায় আসামি হয়ে জেলও খেটেছেন রানা। এখন শুনছি সে ঢাকায় সোহেল রানা হিসেবে পরিচিত!

কলম ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক সদস্য জনাব আলী বলেন, সোহেল রানা ছোটবেলা থেকেই গ্রামে মাদক ও অনলাইন জুয়ায় আসক্ত ছিলেন। পরে স্থানীয় ওয়ার্ড আওয়ামী লীগ নেতা রফিকুল ইসলাম ও ওয়ার্ড যুবলীগের সভাপতি রাকিব মণ্ডলের ডান হাত হিসেবে নানা অপকর্মে জড়িয়ে যান সোহেল রানা। কয়েক বছর যুবলীগের পরিচয়ে এলাকায় ত্রাসের রাজত্বও করেন। এক পর্যায়ে আত্রাই নদীর উপর নির্মিত সেতুর রড ও এলাকায় গরু চুরি করে ধরা খান। তার অপকর্মের শেষ নেই। এখন এলাকাবাসীর দাবি সোহেল রানার সর্বোচ্চ শাস্তি হোক।

তবে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা ও সাবেক ওয়ার্ড সদস্য রফিকুল ইসলামের দাবি, সোহেল রানা তার কোনো ডান হাত ছিলেন না। এলাকার লোকজন হিসেবে উঠাবসা করতেন। অবশ্য তিনিও সোহেল রানার সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করেন।

মহেশচন্দ্রপুর বাজারে গিয়ে কথা হয় রানার চাচা রেজাউল করিমের সঙ্গে। তিনি জানান, ঢাকায় যাওয়ার আগে এই বাজারেই সোহেল রানা সাইকেল মেকারের কাজ করত। তখন পাশের গ্রামে বিয়ে করে একটি ছেলেসন্তান হওয়ার পর ওই স্ত্রীর সঙ্গে ছাড়াছাড়ি হয়। ছোট ভাইয়ের স্ত্রীর সঙ্গে পরকীয়া হওয়ায় ওই সংসারও ভেঙে যায়। পরে বালুয়া বাসুয়া গ্রামের জনৈক জিয়াদুল ইসলামের মেয়েকে বিয়ে করে চার বছর আগে স্ত্রীকে নিয়ে ঢাকায় চলে যায়। এরপর আর বাড়ির সঙ্গে তার যোগাযোগ ছিল না।

তিনি বলেন, তার অপরাধের কোনো ক্ষমা নেই। তার সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করেন।

আর সোহেল রানার বাড়িতে গিয়ে কথা হয় তারা বাবা-মায়ের সঙ্গে। বাবা জেকের আলী বলেন, তার ছেলে মদ-জুয়াসহ নানা অপকর্মের সঙ্গে লিপ্ত ছিল। মানুষের কাছে মোটা অংকের ধার-দেনা করে এলাকাছাড়া হয়। ঈদ-চান্দেও বাড়িতে আসত না। ছেলের সঙ্গে প্রায় চার বছর যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। আর ছেলের দেনা পরিশোধ করতে গিয়ে তিনি নিঃস্ব হয়ে গেছেন। তাই মনের দুঃখে ওই ছেলের আর খবর নেননি। তবে তার অপকর্মের সর্বোচ্চ শাস্তি হওয়া দরকার বলে মনে করেন।

সোহেল রানার মা খাদিজা বেগম বলেন, এমন কুলাঙ্গার ছেলের প্রতি তার আর ভালোবাসা নেই। সে খুব খারাপ কাজ করেছে। তার বিচার দাবি করেন। এই দাবি এখন এক মায়ের নয়। এই দাবি এলাকার সবার। ছেলের অপকর্মের জন্য তারাও লজ্জিত।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

MD Ayan

শিশু রামিসা হত্যা, যুবলীগ কর্মী সোহেল রানার মৃত্যুদণ্ড চান স্বজনরা

Update Time : ১০:৫২:৪৫ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২২ মে ২০২৬

রাজধানীর পল্লবীতে দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী রামিসা আক্তার হত্যা মামলার প্রধান আসামি যুবলীগ কর্মী সোহেল রানাকে ঘিরে সামনে এসেছে অতীত জীবনের নানা অপকর্মের তথ্য।

রানার জন্ম ও বেড়ে ওঠা নাটোরের সিংড়া উপজেলার কলম ইউনিয়নের মহেষচন্দ্রপুর গ্রামে। চার বছর আগে প্রথম স্ত্রীর সঙ্গে বিচ্ছেদের পর তিনি দ্বিতীয় বিয়ে করে সেই স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে ঢাকায় বসবাস শুরু করেন। এরপর থেকে গ্রামে পরিবারের সঙ্গে তার যোগাযোগ প্রায় বিচ্ছিন্ন ছিল।

শুক্রবার (২২ মে) সকালে মহেষচন্দ্রপুর গ্রামে গিয়ে কথা হয় সোহেল রানার বাবা-মাসহ পরিবারের সদস্য ও স্বজনদের সঙ্গে। যুবলীগ কর্মী সোহেল রানার এমন অপকর্মের জন্য তার সর্বোচ্চ শাস্তি চেয়েছেন তার বাবা-মা, বোনসহ পরিবারের সদস্যরাও।

প্রতিবেশী স্থানীয় সাবেক পৌর কাউন্সিলর মহিদুল ইসলাম বলেন, ছোটবেলায় সবাই তাকে রানা নামে ডাকত। প্রাথমিকের গণ্ডি পেরিয়ে তার আর লেখাপড়া হয়নি। তরুণ বয়সে স্থানীয় আওয়ামী যুবলীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে ব্যাপক পরিচিতি পায়। তখন তিনি নিজেকে এসএম রানা বলে পরিচয় দিতেন এবং পরিচিতি বাড়াতে স্থানীয় বাজারে যুবলীগ কর্মী পরিচয়ে বিলবোর্ডও দেন।

সেই সময় কলম ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক ওয়ার্ড সদস্য রফিকুল ইসলামের (মেম্বার) ডান হাত হিসেবে এলাকায় নানা অপকর্মে জড়িয়ে পড়েন। স্থানীয় একটি সেতুর নির্মাণ সামগ্রী ও রড চুরির মামলায় আসামি হয়ে জেলও খেটেছেন রানা। এখন শুনছি সে ঢাকায় সোহেল রানা হিসেবে পরিচিত!

কলম ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক সদস্য জনাব আলী বলেন, সোহেল রানা ছোটবেলা থেকেই গ্রামে মাদক ও অনলাইন জুয়ায় আসক্ত ছিলেন। পরে স্থানীয় ওয়ার্ড আওয়ামী লীগ নেতা রফিকুল ইসলাম ও ওয়ার্ড যুবলীগের সভাপতি রাকিব মণ্ডলের ডান হাত হিসেবে নানা অপকর্মে জড়িয়ে যান সোহেল রানা। কয়েক বছর যুবলীগের পরিচয়ে এলাকায় ত্রাসের রাজত্বও করেন। এক পর্যায়ে আত্রাই নদীর উপর নির্মিত সেতুর রড ও এলাকায় গরু চুরি করে ধরা খান। তার অপকর্মের শেষ নেই। এখন এলাকাবাসীর দাবি সোহেল রানার সর্বোচ্চ শাস্তি হোক।

তবে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা ও সাবেক ওয়ার্ড সদস্য রফিকুল ইসলামের দাবি, সোহেল রানা তার কোনো ডান হাত ছিলেন না। এলাকার লোকজন হিসেবে উঠাবসা করতেন। অবশ্য তিনিও সোহেল রানার সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করেন।

মহেশচন্দ্রপুর বাজারে গিয়ে কথা হয় রানার চাচা রেজাউল করিমের সঙ্গে। তিনি জানান, ঢাকায় যাওয়ার আগে এই বাজারেই সোহেল রানা সাইকেল মেকারের কাজ করত। তখন পাশের গ্রামে বিয়ে করে একটি ছেলেসন্তান হওয়ার পর ওই স্ত্রীর সঙ্গে ছাড়াছাড়ি হয়। ছোট ভাইয়ের স্ত্রীর সঙ্গে পরকীয়া হওয়ায় ওই সংসারও ভেঙে যায়। পরে বালুয়া বাসুয়া গ্রামের জনৈক জিয়াদুল ইসলামের মেয়েকে বিয়ে করে চার বছর আগে স্ত্রীকে নিয়ে ঢাকায় চলে যায়। এরপর আর বাড়ির সঙ্গে তার যোগাযোগ ছিল না।

তিনি বলেন, তার অপরাধের কোনো ক্ষমা নেই। তার সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করেন।

আর সোহেল রানার বাড়িতে গিয়ে কথা হয় তারা বাবা-মায়ের সঙ্গে। বাবা জেকের আলী বলেন, তার ছেলে মদ-জুয়াসহ নানা অপকর্মের সঙ্গে লিপ্ত ছিল। মানুষের কাছে মোটা অংকের ধার-দেনা করে এলাকাছাড়া হয়। ঈদ-চান্দেও বাড়িতে আসত না। ছেলের সঙ্গে প্রায় চার বছর যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। আর ছেলের দেনা পরিশোধ করতে গিয়ে তিনি নিঃস্ব হয়ে গেছেন। তাই মনের দুঃখে ওই ছেলের আর খবর নেননি। তবে তার অপকর্মের সর্বোচ্চ শাস্তি হওয়া দরকার বলে মনে করেন।

সোহেল রানার মা খাদিজা বেগম বলেন, এমন কুলাঙ্গার ছেলের প্রতি তার আর ভালোবাসা নেই। সে খুব খারাপ কাজ করেছে। তার বিচার দাবি করেন। এই দাবি এখন এক মায়ের নয়। এই দাবি এলাকার সবার। ছেলের অপকর্মের জন্য তারাও লজ্জিত।