1:32 pm, Saturday, 9 May 2026

পশ্চিমবঙ্গের নতুন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী কে?

 

পশ্চিমবঙ্গের নতুন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী কে?

 ডেস্ক

প্রকাশ : ০৮ মে ২০২৬, ১১:০২ পিএম

পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার দৌড়ে তিনিই এগিয়ে ছিলেন, তাঁকে ঘিরেই চলছিল আলোচনা। অবশেষে নানা জল্পনা-কল্পনার পর, দীর্ঘ ১৫ বছরের তৃণমূল শাসনের অবসান ঘটিয়ে পশ্চিমবঙ্গের নতুন মুখ্যমন্ত্রী হতে যাচ্ছেন রাজ্য বিজেপি’র শীর্ষস্থানীয় নেতা শুভেন্দু অধিকারী।

শুক্রবার (৮ মে) বিকেলে রাজ্যের নতুন মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে বিজেপি’র তরফ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁর নাম ঘোষণা করা হয়েছে। শনিবার (৯ মে) পশ্চিমবঙ্গের নবম মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেবেন তিনি।

এর আগে, শুক্রবার কলকাতায় বিজেপি’র বিধায়কদের বৈঠকে দলটির বিধায়ক পরিষদের নেতা নির্বাচিত হন শুভেন্দু অধিকারী। বৈঠকের শুরুতে পরিষদের নেতা হিসেবে শুভেন্দু’র নাম প্রস্তাব করেন বিজেপির প্রবীণ নেতা ও প্রাক্তন রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষ।

সভায় কেন্দ্রীয় পর্যবেক্ষক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। তিনি এই প্রস্তাবে অনুমোদন দিয়ে ঘোষণা করেন, ‘আমি শুভেন্দু অধিকারীকে পশ্চিমবঙ্গ বিজেপি সংসদীয় দলের নেতা হিসেবে নির্বাচিত ঘোষণা করছি।’ এসময় বৈঠকে সহ-পর্যবেক্ষক হিসেবে আরও উপস্থিত ছিলেন ওড়িশার মুখ্যমন্ত্রী মোহন চরণ মাঝি।

উল্লেখ্য, সোমবার (৪ মে) প্রকাশিত পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভার ২৯৩ আসনের ফলাফলে দেখা যায়, নরেন্দ্র মোদির বিজেপি ২০৭টি আসনে জয়লাভ করে। বিপরীতে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল কংগ্রেসের ঝুলিতে পড়ে মাত্র ৮০টি আসন। এর মধ্য দিয়ে নিশ্চিত হয়ে যায়, রাজ্যে ১৫ বছরের মমতা অধ্যায়ের অবসান হতে চলেছে।

 

 

বিজেপি’র এই বিশাল জয়কে ঐতিহাসিক আখ্যা দিয়ে অমিত শাহ বলেন, ‘বাম আমল থেকে যে ভয়ের পরিবেশ তৈরি হয়েছিল, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাকে আরও গভীর করেছিলেন। সেখানে ভোট দেওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ওপর আস্থা রাখার জন্য বাংলার মানুষকে ধন্যবাদ। এটি শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের আদর্শের সরকার।’

 

 

গত মাসে অনুষ্ঠিত বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির এই অভাবনীয় সাফল্য মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে সবচেয়ে বড় বিপর্যয় হিসেবে দেখা হচ্ছে। দীর্ঘ দেড় দশক পর বাংলা পেয়েছে নতুন এক সরকার এবং নতুন নেতৃত্ব।

শুভেন্দু অধিকারী ইতোমধ্যেই নিজেকে ‘জায়ান্ট কিলার’ তথা  অজেয়কে জয় করা যোদ্ধারূপে প্রমাণ করেছেন। এবারের নির্বাচনে নন্দীগ্রামে একদিকে যেমন তিনি  নিজের ঘরের আসনটি যেমন ধরে রেখেছেন, অন্যদিকে খোদ মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে তাঁর নিজের দুর্গ বলে পরিচিত ভবানীপুর আসনে ১৫ হাজারেরও বেশি ভোটে পরাজিত করেছেন।

 

 

এর আগে, ২০২১ বিধানসভা নির্বাচনেও মমতাকে নন্দীগ্রামে হারিয়েছিলেন তিনি। পরপর দু’বার রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীকে হারানো ব্যক্তি পরবর্তী মুখ্যমন্ত্রী হবেন না- এমনটা কি হয়! বিজেপি নেতৃত্বও তার অন্যথা করেনি। শুভেন্দু’র হাতেই পশ্চিমবঙ্গের ভার সপে দিয়েছে দল।

এই প্রেক্ষাপটে, পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি’র প্রথম মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী সম্পর্কে চলুন একটু বিস্তারিত জেনে নেওয়া যাক।  

শৈশব ও পারিবারিক ঐতিহ্য
শুভেন্দু অধিকারীর জন্ম ১৯৭০ সালের ১৫ ডিসেম্বর পশ্চিমবঙ্গের পূর্ব মেদিনীপুরের এক রাজনৈতিক পরিবারে। তাঁর বাবা শিশির অধিকারী ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের প্রাক্তন মন্ত্রী এবং মেদিনীপুরের রাজনীতির অন্যতম প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব।

 

 

ছোটবেলা থেকেই রাজনীতির আবহে বেড়ে ওঠা শুভেন্দুর। তাঁর গোটা পরিবারই মেদিনীপুরের রাজনীতির নিয়ন্ত্রক হিসেবে পরিচিত। মেদিনীপুর ও সংলগ্ন এলাকায় তাঁদের দাপট এতটাই যে, এই পরিবারকে ঘিরেই ওই অঞ্চলের জনমত আবর্তিত হয়।

শিক্ষাজীবন
শুভেন্দু তাঁর পড়াশোনা শুরু করেন কাঁথি (কনটাই) হাইস্কুল থেকে। এরপর কাঁথির প্রভাত কুমার কলেজ থেকে স্নাতক এবং পরে রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। ছাত্রজীবন থেকেই তিনি তুখোড় বক্তা এবং সংগঠক হিসেবে পরিচিত ছিলেন।

 

 

রাজনীতির হাতেখড়ি ও নন্দীগ্রামের নায়ক
শুভেন্দুর রাজনৈতিক জীবন শুরু হয়েছিল কংগ্রেসের হাত ধরে। পরে ১৯৯৮ সালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যখন তৃণমূল কংগ্রেস গঠন করেন, তখন অধিকারী পরিবার মমতার প্রধান স্তম্ভ হয়ে দাঁড়ায়।

শুভেন্দুর রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে সবচেয়ে বড় মোড় আসে ২০০৭ সালের নন্দীগ্রাম আন্দোলনের সময়। তৎকালীন বামফ্রন্ট সরকারের জমি অধিগ্রহণের বিরুদ্ধে যে গণআন্দোলন গড়ে উঠেছিল, শুভেন্দু ছিলেন তার সামনের সারির যোদ্ধা। মূলত তাঁর নেতৃত্বেই মেদিনীপুরে বাম দুর্গের পতন ঘটে এবং ২০১১ সালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ক্ষমতায় আসেন।

 

 

মমতা-শুভেন্দু বিচ্ছেদ ও বিজেপিতে যোগদান
তৃণমূল সরকারের অত্যন্ত ক্ষমতাধর মন্ত্রী হওয়া সত্ত্বেও ২০২০ সালে দলের সঙ্গে তাঁর দূরত্ব তৈরি হয়। বিশেষ করে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভাইপো অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উত্থান এবং দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল শুভেন্দুকে বিদ্রোহী করে তোলে।

২০২০ সালের ডিসেম্বরে মেদিনীপুরে অমিত শাহের এক বিশাল জনসভায় তিনি বিজেপিতে যোগ দেন। তাঁর এই দলবদল ছিল পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির ইতিহাসে সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাগুলোর একটি এবং তৃণমূলের জন্য সবচেয়ে বড় ধাক্কা।

২০২৬-এর নির্বাচনে ‘জায়ান্ট কিলার’ শুভেন্দু
২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে শুভেন্দু নন্দীগ্রামে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে হারিয়েছিলেন সামান্য ব্যবধানে। কিন্তু ২০২৬-এর নির্বাচনে তিনি যা করলেন, তা এক প্রকার রাজনৈতিক ইতিহাস। মমতার খাসতালুক বলে পরিচিত ভবানীপুর আসনে শুভেন্দু তাঁকে ১৫ হাজার ১০৫ ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করেন। পাশাপাশি নন্দীগ্রামেও নিজের জয় ধরে রাখেন। এই জয়ই তাঁর জন্য নবান্নের (মুখ্যমন্ত্রীর সচিবালয়) পথ পরিষ্কার করে দেয়।

নেতৃত্ব ও ব্যক্তিত্ব
শুভেন্দু অধিকারী অবিবাহিত এবং একজন পুরোদস্তুর জননেতা। তাঁর মূল শক্তি হলো মাঠপর্যায়ের কর্মীদের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ। তিনি শুধু শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঘরে বসে রাজনীতি করেন না, বরং গ্রাম-বাংলার ধুলোবালিতে সংগঠন সাজাতে পারদর্শী। পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় বিরোধী দলনেতা হিসেবে গত কয়েক বছরে তিনি যে আক্রমণাত্মক ভূমিকা পালন করেছেন, সেটাই বিজেপিকে প্রথমবারের মতো পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় আসতে রসদ জুগিয়েছে।

নতুন সরকার ও আগামীর চ্যালেঞ্জ
শনিবার (৯ মে) ঐতিহাসিক ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে শপথ নিতে চলেছেন শুভেন্দু। মেদিনীপুরের মাটি থেকে উঠে আসা ছেলেটিই আজ গোটা পশ্চিমবঙ্গের ভাগ্যবিধাতা হতে যাচ্ছেন। তবে দীর্ঘদিনের তৃণমূল শাসনের পর ভেঙে পড়া প্রশাসন পুনর্গঠন এবং রাজনৈতিকভাবে মেরুকরণের মধ্য দিয়ে যাওয়া একটি রাজ্যকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার চ্যালেঞ্জ নিতে হবে তাঁকে।

পাশাপাশি রাজ্যের ভঙ্গুর অর্থনীতির পুনর্গঠনও সহজ হবে না তাঁর জন্য। বিশেষ করে বিজেপি’র ‘ডবল ইঞ্জিন’ সরকারের কাছ থেকে রাজ্যবাসীর পাহাড়সম প্রত্যাশা পূরণের চাপ শুরু থেকেই থাকবে তাঁর ওপর।

এই প্রত্যাশা পূরণে তিনি কতটা সফল হবেন সেটা হয়তো সময়ই বলে দেবে। কিন্তু  পূর্ব মেদিনীপুরের ‘ভূমিপুত্র’ থেকে পশ্চিমবঙ্গের ‘মুখ্যমন্ত্রী’—শুভেন্দু অধিকারীর এই উত্তরণ বুঝিয়ে দিচ্ছে,  পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে এক নতুন যুগের সূচনা হলো।

 

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

MD Ayan

পশ্চিমবঙ্গের নতুন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী কে?

Update Time : 11:40:48 pm, Friday, 8 May 2026

 

পশ্চিমবঙ্গের নতুন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী কে?

 ডেস্ক

প্রকাশ : ০৮ মে ২০২৬, ১১:০২ পিএম

পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার দৌড়ে তিনিই এগিয়ে ছিলেন, তাঁকে ঘিরেই চলছিল আলোচনা। অবশেষে নানা জল্পনা-কল্পনার পর, দীর্ঘ ১৫ বছরের তৃণমূল শাসনের অবসান ঘটিয়ে পশ্চিমবঙ্গের নতুন মুখ্যমন্ত্রী হতে যাচ্ছেন রাজ্য বিজেপি’র শীর্ষস্থানীয় নেতা শুভেন্দু অধিকারী।

শুক্রবার (৮ মে) বিকেলে রাজ্যের নতুন মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে বিজেপি’র তরফ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁর নাম ঘোষণা করা হয়েছে। শনিবার (৯ মে) পশ্চিমবঙ্গের নবম মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেবেন তিনি।

এর আগে, শুক্রবার কলকাতায় বিজেপি’র বিধায়কদের বৈঠকে দলটির বিধায়ক পরিষদের নেতা নির্বাচিত হন শুভেন্দু অধিকারী। বৈঠকের শুরুতে পরিষদের নেতা হিসেবে শুভেন্দু’র নাম প্রস্তাব করেন বিজেপির প্রবীণ নেতা ও প্রাক্তন রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষ।

সভায় কেন্দ্রীয় পর্যবেক্ষক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। তিনি এই প্রস্তাবে অনুমোদন দিয়ে ঘোষণা করেন, ‘আমি শুভেন্দু অধিকারীকে পশ্চিমবঙ্গ বিজেপি সংসদীয় দলের নেতা হিসেবে নির্বাচিত ঘোষণা করছি।’ এসময় বৈঠকে সহ-পর্যবেক্ষক হিসেবে আরও উপস্থিত ছিলেন ওড়িশার মুখ্যমন্ত্রী মোহন চরণ মাঝি।

উল্লেখ্য, সোমবার (৪ মে) প্রকাশিত পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভার ২৯৩ আসনের ফলাফলে দেখা যায়, নরেন্দ্র মোদির বিজেপি ২০৭টি আসনে জয়লাভ করে। বিপরীতে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল কংগ্রেসের ঝুলিতে পড়ে মাত্র ৮০টি আসন। এর মধ্য দিয়ে নিশ্চিত হয়ে যায়, রাজ্যে ১৫ বছরের মমতা অধ্যায়ের অবসান হতে চলেছে।

 

 

বিজেপি’র এই বিশাল জয়কে ঐতিহাসিক আখ্যা দিয়ে অমিত শাহ বলেন, ‘বাম আমল থেকে যে ভয়ের পরিবেশ তৈরি হয়েছিল, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাকে আরও গভীর করেছিলেন। সেখানে ভোট দেওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ওপর আস্থা রাখার জন্য বাংলার মানুষকে ধন্যবাদ। এটি শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের আদর্শের সরকার।’

 

 

গত মাসে অনুষ্ঠিত বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির এই অভাবনীয় সাফল্য মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে সবচেয়ে বড় বিপর্যয় হিসেবে দেখা হচ্ছে। দীর্ঘ দেড় দশক পর বাংলা পেয়েছে নতুন এক সরকার এবং নতুন নেতৃত্ব।

শুভেন্দু অধিকারী ইতোমধ্যেই নিজেকে ‘জায়ান্ট কিলার’ তথা  অজেয়কে জয় করা যোদ্ধারূপে প্রমাণ করেছেন। এবারের নির্বাচনে নন্দীগ্রামে একদিকে যেমন তিনি  নিজের ঘরের আসনটি যেমন ধরে রেখেছেন, অন্যদিকে খোদ মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে তাঁর নিজের দুর্গ বলে পরিচিত ভবানীপুর আসনে ১৫ হাজারেরও বেশি ভোটে পরাজিত করেছেন।

 

 

এর আগে, ২০২১ বিধানসভা নির্বাচনেও মমতাকে নন্দীগ্রামে হারিয়েছিলেন তিনি। পরপর দু’বার রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীকে হারানো ব্যক্তি পরবর্তী মুখ্যমন্ত্রী হবেন না- এমনটা কি হয়! বিজেপি নেতৃত্বও তার অন্যথা করেনি। শুভেন্দু’র হাতেই পশ্চিমবঙ্গের ভার সপে দিয়েছে দল।

এই প্রেক্ষাপটে, পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি’র প্রথম মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী সম্পর্কে চলুন একটু বিস্তারিত জেনে নেওয়া যাক।  

শৈশব ও পারিবারিক ঐতিহ্য
শুভেন্দু অধিকারীর জন্ম ১৯৭০ সালের ১৫ ডিসেম্বর পশ্চিমবঙ্গের পূর্ব মেদিনীপুরের এক রাজনৈতিক পরিবারে। তাঁর বাবা শিশির অধিকারী ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের প্রাক্তন মন্ত্রী এবং মেদিনীপুরের রাজনীতির অন্যতম প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব।

 

 

ছোটবেলা থেকেই রাজনীতির আবহে বেড়ে ওঠা শুভেন্দুর। তাঁর গোটা পরিবারই মেদিনীপুরের রাজনীতির নিয়ন্ত্রক হিসেবে পরিচিত। মেদিনীপুর ও সংলগ্ন এলাকায় তাঁদের দাপট এতটাই যে, এই পরিবারকে ঘিরেই ওই অঞ্চলের জনমত আবর্তিত হয়।

শিক্ষাজীবন
শুভেন্দু তাঁর পড়াশোনা শুরু করেন কাঁথি (কনটাই) হাইস্কুল থেকে। এরপর কাঁথির প্রভাত কুমার কলেজ থেকে স্নাতক এবং পরে রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। ছাত্রজীবন থেকেই তিনি তুখোড় বক্তা এবং সংগঠক হিসেবে পরিচিত ছিলেন।

 

 

রাজনীতির হাতেখড়ি ও নন্দীগ্রামের নায়ক
শুভেন্দুর রাজনৈতিক জীবন শুরু হয়েছিল কংগ্রেসের হাত ধরে। পরে ১৯৯৮ সালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যখন তৃণমূল কংগ্রেস গঠন করেন, তখন অধিকারী পরিবার মমতার প্রধান স্তম্ভ হয়ে দাঁড়ায়।

শুভেন্দুর রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে সবচেয়ে বড় মোড় আসে ২০০৭ সালের নন্দীগ্রাম আন্দোলনের সময়। তৎকালীন বামফ্রন্ট সরকারের জমি অধিগ্রহণের বিরুদ্ধে যে গণআন্দোলন গড়ে উঠেছিল, শুভেন্দু ছিলেন তার সামনের সারির যোদ্ধা। মূলত তাঁর নেতৃত্বেই মেদিনীপুরে বাম দুর্গের পতন ঘটে এবং ২০১১ সালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ক্ষমতায় আসেন।

 

 

মমতা-শুভেন্দু বিচ্ছেদ ও বিজেপিতে যোগদান
তৃণমূল সরকারের অত্যন্ত ক্ষমতাধর মন্ত্রী হওয়া সত্ত্বেও ২০২০ সালে দলের সঙ্গে তাঁর দূরত্ব তৈরি হয়। বিশেষ করে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভাইপো অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উত্থান এবং দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল শুভেন্দুকে বিদ্রোহী করে তোলে।

২০২০ সালের ডিসেম্বরে মেদিনীপুরে অমিত শাহের এক বিশাল জনসভায় তিনি বিজেপিতে যোগ দেন। তাঁর এই দলবদল ছিল পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির ইতিহাসে সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাগুলোর একটি এবং তৃণমূলের জন্য সবচেয়ে বড় ধাক্কা।

২০২৬-এর নির্বাচনে ‘জায়ান্ট কিলার’ শুভেন্দু
২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে শুভেন্দু নন্দীগ্রামে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে হারিয়েছিলেন সামান্য ব্যবধানে। কিন্তু ২০২৬-এর নির্বাচনে তিনি যা করলেন, তা এক প্রকার রাজনৈতিক ইতিহাস। মমতার খাসতালুক বলে পরিচিত ভবানীপুর আসনে শুভেন্দু তাঁকে ১৫ হাজার ১০৫ ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করেন। পাশাপাশি নন্দীগ্রামেও নিজের জয় ধরে রাখেন। এই জয়ই তাঁর জন্য নবান্নের (মুখ্যমন্ত্রীর সচিবালয়) পথ পরিষ্কার করে দেয়।

নেতৃত্ব ও ব্যক্তিত্ব
শুভেন্দু অধিকারী অবিবাহিত এবং একজন পুরোদস্তুর জননেতা। তাঁর মূল শক্তি হলো মাঠপর্যায়ের কর্মীদের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ। তিনি শুধু শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঘরে বসে রাজনীতি করেন না, বরং গ্রাম-বাংলার ধুলোবালিতে সংগঠন সাজাতে পারদর্শী। পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় বিরোধী দলনেতা হিসেবে গত কয়েক বছরে তিনি যে আক্রমণাত্মক ভূমিকা পালন করেছেন, সেটাই বিজেপিকে প্রথমবারের মতো পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় আসতে রসদ জুগিয়েছে।

নতুন সরকার ও আগামীর চ্যালেঞ্জ
শনিবার (৯ মে) ঐতিহাসিক ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে শপথ নিতে চলেছেন শুভেন্দু। মেদিনীপুরের মাটি থেকে উঠে আসা ছেলেটিই আজ গোটা পশ্চিমবঙ্গের ভাগ্যবিধাতা হতে যাচ্ছেন। তবে দীর্ঘদিনের তৃণমূল শাসনের পর ভেঙে পড়া প্রশাসন পুনর্গঠন এবং রাজনৈতিকভাবে মেরুকরণের মধ্য দিয়ে যাওয়া একটি রাজ্যকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার চ্যালেঞ্জ নিতে হবে তাঁকে।

পাশাপাশি রাজ্যের ভঙ্গুর অর্থনীতির পুনর্গঠনও সহজ হবে না তাঁর জন্য। বিশেষ করে বিজেপি’র ‘ডবল ইঞ্জিন’ সরকারের কাছ থেকে রাজ্যবাসীর পাহাড়সম প্রত্যাশা পূরণের চাপ শুরু থেকেই থাকবে তাঁর ওপর।

এই প্রত্যাশা পূরণে তিনি কতটা সফল হবেন সেটা হয়তো সময়ই বলে দেবে। কিন্তু  পূর্ব মেদিনীপুরের ‘ভূমিপুত্র’ থেকে পশ্চিমবঙ্গের ‘মুখ্যমন্ত্রী’—শুভেন্দু অধিকারীর এই উত্তরণ বুঝিয়ে দিচ্ছে,  পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে এক নতুন যুগের সূচনা হলো।